Sunday, September 14, 2014

চিঠিবন্ধু আমার

প্রিয় সুজানা,

বিশবছর। হ্যাঁ, বিশবছর পর তোকে লিখতে বসেছি সুজানা। তুই ছিলে আমার চিঠিবন্ধু। প্রাণের বান্ধব। সুজন আর স্বজন আমার। 

মনে কি আছে তোর- আমাদের মধ্যে কে আগে চিঠি লিখেছিলাম? তুই ছিলি চট্টগ্রামের কুমিরার মেয়ে। ডাক্তার বাবার আদরের কন্যা। আমি থাকতাম তখন পতেঙ্গায়। আমাদের বয়স তখন? টিন এজের শেষদিকে দুজনই। চিঠিতে আমরা খুব অল্পদিনে আপনি থেকে তুমি এবং তা থেকে তুই পর্যায়ে চলে আসি। এটা অপরিহার্য ছিলো যেনো। 

হাতের লেখা খুব সুন্দর ছিলো তোর। গোটা গোটা। স্পষ্ট। আর আমার কিঞ্চিৎ খারাপ। একটু কাত করে লিখতাম আমি। কতো চিঠি লিখেছি আমরা তা কি তুই বলতে পারবি সুজানা? জানি পারবি না। প্রায় প্রতিদিন তোর চিঠি পেতাম। চিঠিগুলো তোর অনেক লম্বা হতো। এক চিঠি বারবার পড়তাম। নেশার মতো। 

সবচেয়ে বড়ো ব্যাপার ছিলো আমাদের চিঠিতে কোনো প্রেমের কথা থাকতো না। আমাদের আলোচনা হতো- সাহিত্য নিয়ে । সম্প্রতি পড়া কোনো বইয়ের প্রধান চরিত্র নিয়ে। নারী-পুরুষের সম্পর্ক নিয়েও আমরা লিখতাম। কিন্তু তা শালীনতার ভেতর, সৃষ্টিশীল গণ্ডির মধ্যে। 

পরবরতীতে, তুই বাংলা সাহিত্য নিয়ে লেখাপড়া করলি। আর আমি ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে। দুজনেই তখন পত্রিকায় লেখতাম। তোর চিঠিগুলোকেও আমি সাহিত্যকর্ম মনে করতাম। আসলে ওগুলো ছিলো পত্রসাহিত্য। ছেলে ও মেয়েতে যে প্রেম ছাড়াও শুধু বন্ধুতা হতে পারে, তার উত্তম উদাহরণ বোধহয় আমরাই। হাসি পায় আজও-- একবার তুই ৪৪ পৃষ্ঠার এক বিশাল চিঠি পাঠিয়েছিলি। আর একবার পুরো এক রাইটিং প্যাড লিখে খামে ভরে। কী পাগল ছিলাম আমরা, নারে? 

যাক, আজ এতো ইতিহাস টেনে তোর সময় নষ্ট করার অভিপ্রায় আমার নেই বন্ধু। সব গল্পই যেমন শেষ হয়, আমাদের দীর্ঘ দশ বছরের বন্ধুতার মধ্যেও ছেদ পড়েছিলো। অন্তত চিঠি লেখায়। আমরা সেসময় কাছাকাছি থাকলেও দুজনে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম দেখা না করার। এক সময়, পেশাগত কারণে আমার চলে আসতে হয় ঢাকায়। আমাদের বন্ধুতা তখনও বহাল ছিলো। ছিলো স্নিগ্ধ চিঠিও। 

সময়ের পরিক্রমায় আমি বিয়ে করি। তুইও হোস সংসারী। আমি চেয়েছিলাম আমাদের বন্ধতাটা তবু থাকুক। পারিবারিকভাবেই। হয়তো চেয়েছিলিস তুইও। কিন্তু তা হয়নি। আমার স্ত্রী এবং তোর স্বামী তা মেনে নেননি। আমরা অনেক দূরের হয়ে গেলাম। 

আজ বিশ বছর তোকে মনে পড়ছে সুজানা। ক্ষতি কি হতো কোনো আমাদের বন্ধুতায়! আজ তুইও আছিস ভালো আর আমিও মন্দ না। কিন্তু তবু আমাদের বন্ধুতার সেদিনগুলো কি কভু ভুলা যায়!! 

শিল্পী সায়ানের সেই গানেই বলতে হয়ঃ 

কেন বাড়লে বয়স
ছোট্টবেলার বন্ধু হারিয়ে যায়
কেন হারাচ্ছে সব বাড়াচ্ছে ভিড়
হারানোর তালিকায়

আজ কে যে কোথায় আছি
কোন খবর নেই তো কারো
অথচ তোর ঐ দুঃখগুলোতে
অংশ ছিল আমারও

এই চলতি জীবন ঘটনাবহুল
দু’ এক ইঞ্চি ফাঁকে
তুইতো পাবিনা আমায়
আর আমিও খুঁজিনা তোকে

আজ চলতে শিখে গেছি
তোকে নেই কিছু প্রয়োজন
তবু ভীষন অপ্রয়োজনে তোকেই
খুঁজছে আমার মন

তুই হয়তো ভালোই আছিস
আর আমিও মন্দ নেই
তবু অসময়ে এসে স্মৃতিগুলো বুকে
আঁকিবুকি কাটবেই

তুই কতদুরে চলে গেলি, তোকে হারিয়ে ফেলেছি আমি
এই দুঃখটা হয়ে থাক, এই দুঃখটা বড় দামী 

কোন শত্রুরও যেন প্রাণের বন্ধু
এমন দূরে না যায়
শোন বন্ধু কখনো কোন বন্ধুকে
বলোনা যেন বিদায়


(সায়ানের গান সংক্ষেপিত)

তুই তো জানিস সুজানা, এখন কেউ আর চিঠি লেখে না। এস এম এস, ফেসবুক, টুইটার, হোয়াটসআপ, স্কাইপে এসব টেকনোলজি আমাদের চিঠিকে নির্বাসনে পাঠিয়েছে। আমার খুব কষ্ট হয় জানিস বন্ধু?


চিঠি তুমি হারিয়ে গেছো; তোমার জন্য মায়া
ফেসবুক, টুইটার, ইমেইল -এখন তোমার ছায়া
এ কী মডার্ন ফ্রিক
আমি নস্টালজিক
স্বপ্নে আমি আজও দেখি তোমার প্রেম্নিল কায়া।।
 
(পরানের কথা'র লিমেরিক)

বিশবছর। বিশ বছর পর তোকে লেখা এ চিঠি জানি না তুই পাবি কি না। কেমন লাগবে তোর?

ভালো থাকিস। মনে রাখিস আমরা বন্ধু ছিলাম। চিঠিবন্ধু হলেও।

ইতি

ভেবে নিস আমি কে তোর
১৪/০৬/২০১৪

No comments:

Post a Comment

Featured Post

কষ্টযাপন

তাদের কষ্টবিলাস থাকে আমার কষ্ট বোধযাপন, আমার রঙের আকাশ দেখে ভাবে তারা উদযাপন। #অণুঅনুভব

জনপ্রিয়