Thursday, October 16, 2014

স্বপ্ন যদি সত্যি হতো

হঠাৎ  ঘুম ভেঙ্গে যায় টুনির। রাত দুপুরে। একটা সুন্দর স্বপ্ন দেখছিল সে। এ বাড়ির বেগম সাহেবা, যাকে সে খালাম্মা বলে ডাকে, তিনি তাকে আদর করছেন। ভালোভাবে কথা বলছেন টুনির সাথে। কাজের শেষে তিনি তাকে পড়াচ্ছেন। মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন।

স্বপ্নটা ভেঙ্গে গেলো। অতো ভালো একটা স্বপ্ন। সে আবার ঘুমোতে চেষ্টা করে। কিন্তু ঘুম আর আসে না।

নাম তার টুনি। তবে এ বাড়ির মানুষজন মাঝেমধ্যে তাকে টুইন্যা বলে ডাকে। সে অবশ্য রাগ করে না এজন্য।

ছ' থেকে এগারো। পাঁচ পাচটি বছর। এ পাঁচটি বছর এ বাড়িতে কেটেছে টুনির। মায়ের কথা তার মনে পড়ে। মনে পড়ে তার মা বাড়ি বাড়ি কাজ করতো। ফিরতো সেই সন্ধ্যায়-- তিন-সন্ধ্যের সময়। ফিরেই কত্তো আদর করতো টুনিকে। বুকে জড়িয়ে রাখতো। চুমু খেতো। রাতে কিচ্ছা শুনাতো। কাঠুরিয়ার মেয়ে আর রাজপুত্তরের কিচ্ছা-" এক দ্যাশে আছিলো এক কাঠুইরা। তার আছিলো এক মাইয়া। খুবই সোন্দর। একদিন এক রাজপুত্তর বনে শিকার করতে আইস্যা তারে দেইখ্যা বিয়া কইরা নিয়া যাইবার চাইলো...........।"  এ পর্যন্ত শুনেই ঘুমিয়ে পড়তো টুনি। বিয়েটা শেষ পর্যন্ত হলো কি না, আজো তার জানা হয়নি।

একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে পাশ ফিরে শোয় টুনি। একদিন তিন-সন্ধ্যে পেরিয়ে যাচ্ছিলো। মা তবু ফিরছিলো না। অন্ধকার হয়ে গেলো। মা তবু এলো না। তার বাবা দিন-মজুরের কাজ করতো। সেও সেদিন আসছিলো না। রাগ করে টুনি বৃদ্ধা দাদির ঘরে গিয়ে কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়লো। কিছু খেলো না সে।

সে রাতে টুনির মা ঠিকই এসেছিলো। এসেছিলো লাশ হয়ে। তাদের গাঁয়ের মধ্য দিয়ে একটা সড়ক ঢাকা থেকে ময়মনসিংহ চলে গেছে। কাজ সেরে বাড়ি ফেরার সময় একটা ট্রাক এসে আচমকা.........। একটা চাপা চিৎকার ছাড়া টুনির মায়ের বেশি কিছু করার ছিলো না। রাতেই টুনির মাকে দাফন করা হয়।

পরদিন সকালে উঠে টুনি জানতে চেয়েছিলো তার মায়ের কথা। সবাই তাকে তাকে মিথ্যে আশ্বাস দিয়েছিলো। বলেছিলো তার মা তার খালার বাড়িতে থেকে কয়েকদিন কাজ করবে। আসার সময় টুনির পুতুলের জন্য শাড়ি নিয়ে আসবে। কথা শুনে প্রতিবাদ করেনি টুনি। কারণ একটা ভালো শাড়ির জন্য তার পুতুলটাকে রুমার পুতুলের সাথে বিয়ে দেয়া যাচ্ছিলো না।

কিছুদিন পরে লাল শাড়ি-পরা একজন মহিলা এলো তাদের বাড়ি। টুনিদের ঘরেই থাকে। প্রথম প্রথম চিনতো না টুনি। বাড়ির লোকেরা বলে দিলো- এ মহিলা তার মা। নতুন মা। সেদিনই টুনি বুঝে নিয়েছিলো তার মা আর আসবে না কোনোদিন। নতুন মাকে টুনি মা বলে ডাকলো না।

কেউ যখন বাড়ি না থাকতো, ভারি ভারি কিল পড়তো টুনির পিঠে। নতুন মা তাকে মারতো। বকতো। দোষ দেখিয়ে টুনির বাবার কাছে নালিশ জানাতো। বাবাটাও যেনো কেমন হয়ে গেছিলো। কিচ্ছুটি বলতো না। মাঝেমধ্যে মারতো টুনিকেই। নিজেও কাঁদতো নীরবে।

এক মহিলাকে ধরে ঢাকার এ বাড়িতে টুনির কাজের ব্যবস্থা করা হলো। সেদিন বাবাকে ছেড়ে আসতে বড় কষ্ট হয়েছিলো টুনির।

বাড়ির বেগম সাহেবা তাকে সারাদিনই এটাওটা নিয়ে মেজাজ দেখান। কিলটি, চড়টি মারেন। লাথিও বসান মাঝেমধ্যে। ঊনিশ থেকে বিশ হবার জো নেই। বেগম সাহেবার ছেলেমেয়েরা পড়ে। স্কুল- কলেজে না কোথায় যেনো যায় রোজ। এসব টুনি বুঝে না। সে তো আর যায়নি কোনোদিন। তবে মা তাকে বলতো, "আমার টুনিরে আমি ইস্কুলে পড়াইয়াম।"  সেসব কথা আজ আর মনে করতে চায় না টুনি।

একদিন এ বাড়ির লিজা আপাকে দুধ গরম করে একটু দেরি হয়েছিলো বলে  যা একটা চড় বসিয়েছিলো টুনির কচি গালটায়।

ঘুম আর হলো না সে রাতে টুনির। ভাবলো সে-- আজকের স্বপ্নটা যদি সত্যি হতো! যদি সবাই তাকে ভালোবাসতো। আদর করতো। তাহলে সে আরো বেশি কাজ করতে পারতো। কততো ভালোই না হতো তাহলে।

মেঝের উপর এপাশ-ওপাশ করতে করতে ভোর হয়ে গেলো। মসজিদ থেকে আযান শোনা গেলো। তাড়াতাড়ি উঠে পড়লো টুনি। তার এখন অনেক কাজ... ।


পাদটীকাঃ ছোটদের দিন আজ। তাই আমার কৈশোরে লেখা এই গল্পটি শেয়ার করলাম। গল্পটি দৈনিক আজাদ-এ ০৫/১১/১৯৮৯ (কার্তিক ২১, ১৩৯৬ বাংলা) তারিখে প্রকাশিত।

No comments:

Post a Comment

Featured Post

কষ্টযাপন

তাদের কষ্টবিলাস থাকে আমার কষ্ট বোধযাপন, আমার রঙের আকাশ দেখে ভাবে তারা উদযাপন। #অণুঅনুভব

জনপ্রিয়